কুলকুণ্ডলিনী শক্তি (তিন) ( তথ্যসূত্র : বাংলার বাউল ও বাউল গান - অধ্যাপক উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য )
অনাহত, বিশুদ্ধ, আজ্ঞা চক্র
বায়ুর সঙ্গে চৈতন্য শক্তি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। তাই সাধকগণ বায়ুর সাহায্যে চৈতন্যকে ধরতে চায়। পঞ্চবায়ুর মধ্যে নাভিদেশ থেকে নিচের দিকে সমান বায়ুর কর্মক্ষেত্র। আর এই সমান বায়ু সব সময় নিম্নমুখী। এই সমান বায়ুর সাহায্যেই আমাদের বর্জ্যপদার্থ নিচের দিকে চলে যায়। সন্তানের জন্ম হয়। আমাদের বীর্য নিম্নগামী হয়ে সৃষ্টি রক্ষা করে। তাই এই তিনটি অঞ্চলে অর্থাৎ মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, ও মনিপুরে আমরা যদি বেশী ধ্যান দেই তবে নিম্নগামী বিশ্বশক্তি আরো কার্যকরী হয়ে উঠবে। এবং আমাদেরকে নিম্নগামী করবে। এবং আমরা লক্ষভ্রষ্ট হবো। তাই আমাদের মনে রাখতে হবে, এই তিনটি কেন্দ্রে আমাদের ধ্যান যেন নামমাত্র হয়। আসলে অনাহত চক্র থেকে আমাদের ধ্যানের শুরু হবে, যদি আমরা ঈশ্বরের খেলা, বা বিশ্বশক্তিকে অনুভব করতে চাই।
অনাহত চক্র :
মনিপুর চক্রের উপরিভাগে দ্বাদশদল বিশিষ্ট অনাহত পদ্ম। আমাদের বুকের ভিতরে যে হৃৎপিন্ড আছে, ঠিক তার সোজাসুজি, মেরুদন্ডের মধ্যে আছে অনাহত চক্র। তান্ত্রিক সাধকগণ বলছেন, আমাদের হৃদয় দেশে উজ্জ্বল লহিত বর্ণের এই বারোটি পাপড়ি বিশিষ্ট একটি পদ্ম আছে । এই পদ্মের প্রত্যেকটি পাপড়িতে সিঁদুর রঙের অনুস্বর যুক্ত ক, খ, অর্থাৎ কঁ,খঁ,গঁ,ঘঁ,ঙঁ, চঁ,ছঁ,জঁ,ঝঁ,ঞঁ, টঁ,ঠঁ - এর অধিষ্ঠান । এই পদ্মের অভ্যন্তরে ধুম্র বর্ণের একটি ছয়কোন বিশিষ্ট বায়ুমণ্ডল শোভা পাচ্ছে। এই বায়ুমণ্ডলের মধ্যে ত্রিকোণ-যুক্ত কোটি বিদ্যুৎ-প্রভাযুক্ত সূর্য্যমন্ডল অবস্থান করছে। এইযে ছয়কোন যুক্ত বায়ুমণ্ডল, এর মধ্যে ধুম্রবর্ণের চতুস্কোন বায়ুবীজ "যং" বর্তমান। এই বায়ুবীজ "যং" আবার কৃষ্ণসার হরিনের পিঠে অবস্থান করছে। এই বায়ুবীজের মধ্যে স্থলে স্বয়ং ঈশ্বর ঈশান নামক শিব হয়ে অবস্থান করছেন। এই ঈশান শিব হাঁসের মতো শ্বেতবর্ণের। ইনি দ্বিহস্ত বিশিষ্ট। বরাভয় মুদ্রায় অবস্থান করছেন। এনার তিনটি নেত্র।এই পদ্মে আরো অবস্থান করছেন কাকিনী শক্তি। যিনি বিদ্যুতের ন্যায় পীতবর্ণা। ইনি নানা অলংকার শোভিতা, চতুর্ভূজা, কঙ্কাল-মালা ধারিনী। ইনি আনন্দে উন্মত্ত। অমৃত রসে অভিষিক্ত হৃদয় সম্পন্ন। বরাভয়কারীনি ।এই পদ্মের মধ্যস্থ যে বীজ কোষ অর্থাৎ কর্ণিকা আছে তার ত্রিকোণে অবস্থান করছেন, বাণলিঙ্গ শিব ও ত্রিনেত্রা নামের শক্তি বিরাজমান। এই বানলিঙ্গের মস্তক অর্ধচন্দ্র শোভিত। আর ত্রিনেত্রাদেবী শক্তি কোটি-বিদ্যুৎ-তুল্য কোমলাঙ্গী।
বিশুদ্ধ চক্র :
গলায় আমাদের যে কন্ঠা আছে, তার ঠিক পিছনে, মেরুদণ্ডের মধ্যে অবস্থান করছে বিশুদ্ধ চক্র। এই বিশুদ্ধ চক্র ষোড়শদল পদ্ম বিশিষ্ট। এই পদ্ম ধোঁয়াটে রঙের। আর এই ষোলোটি পদ্মের মধ্যে লোহিত বর্ণের বিন্দু-যুক্ত ষোলোটি স্বরবর্ণ লিপিবদ্ধ আছে। এই বর্ণগুলো হচ্ছে, অ, আ, ই, ঈ,উ,ঊ,ঋ,এ,ঐ,ও,ঔ, ঋ,ঌ,ৡ,এ,ঐ,ও,ঔ,অং,অঃ। এই পদ্মে পূর্ন চাঁদের মতো গোলাকার একটা নভোমণ্ডল আছে। আর এই নভোমন্ডল মধ্যে একটা সাদা রঙের হাতির পিঠে ব্যোম বীজ হং অবস্থান করছে। এটি পাশাঙ্কুশ বরাভয় হস্ত বিশিষ্ট। অঙ্কুশ কথাটার অর্থ হচ্ছে, হাতিকে চালান করবার লৌহদণ্ড যার মুখটা সুচালু ও বাঁকা। এই "হং" কারের যে গগনমণ্ডল তার মধ্যে অবস্থান করছেন, দশ হাত বিশিষ্ট, পাঁচটি মুখ বিশিষ্ট, তিনটি নেত্র বিশিষ্ট, বাঘের চামড়া পরিহিত অর্ধ-নারীশ্বর সদাশিব বিরাজ করছেন। তিনি বৃষপৃষ্ঠে আরোহন করে আছেন, তাঁর দক্ষিণভাগ শ্বেতবর্ণ আর বাম ভাগ স্বর্ণবর্ন। তাঁর দশহাতে শুল,ডঙ্কা, খড়্গ, বজ্র, দাহন অর্থাৎ আগ্নেয়াস্ত্র, একটি বিশাল সাপ, ঘন্টা, অঙ্কুশ, পাশ ও অভয়মুদ্রা। এই পদ্মের কর্নিকায় অর্থাৎ পদ্মবীজে শাকিনী শক্তি বিদ্যমান। ইনি শ্বেতবর্ণা, পিত-বসনা, চতুর হস্ত বিশিষ্ট। আর এই চার হাতে, শর, ধনু,পাশ, অঙ্কুশ ধারণ করে আছেন । এইবার কর্নিকার ভিতরে, আছে নিস্কলঙ্ক বিশুদ্ধ শশাঙ্ক মন্ডল। এই শশাঙ্ক মন্ডলকেই মনে করা হয়, অতিশয় বিশুদ্ধ ব্যক্তির মুক্তিদ্বার স্বরূপ।
আজ্ঞা চক্র : আজ্ঞাচক্রের অবস্থান মেরুদণ্ডের মধ্যে নয়, এটির অবস্থান মাথায়।আমাদের ভ্রুদ্বয়ের পিছনদিকে মাথায় মধ্যে এর অবস্থান। তন্ত্রমতে ভ্রূ-দ্বয়ের মধ্যে অবস্থান করছে, আমাদের আজ্ঞাচক্র। এখানে দ্বিদল বিশিষ্ট অজ্ঞাপদ্ম বিরাজ করছে। এই পদ্ম, শশধর সম উজ্বল শ্বেত বর্ণের। এই দ্বিদল পদ্মের দুটি পাপড়িতে আছে অনুস্বর-যুক্ত হঁ ও ক্ষঁ। এই আজ্ঞা চক্রের মধ্যেই আছে ষড়াননা। অর্থাৎ ছটি মুখ বিশিষ্ট মাতৃমূর্তি। যার প্রত্যেকটি আননে অর্থাৎ মুখে তিনটি নয়ন, চারটি হাত। এক হাতে বিদ্যামুদ্রা, এক হাতে ডমরু, একহাতে জপমালা, আর এক হাতে কপাল অর্থাৎ মাথার খুলি। পূর্ন চন্দ্রের মতো শুভ্র জ্যোতিসম্পন্ন। এঁনাকে বলা হয় হাকিনী শক্তি। এই অক্ষি মধ্যস্থ দ্বিদল যুক্ত পদ্মের মধ্যস্থলে বিরাজ করছেন, যোনি রূপিণী ত্রিকোণ। যার প্রত্যেকটি কোনে ইতর-শিবলিঙ্গ বিদ্যমান। এই শিবলিঙ্গ তরিৎমালার মতো উজ্বল। এবং এই স্থানে বেদের প্রথম বীজ ওঁকার অবস্থিত। আর এই পদ্মের মধ্যে আমাদের সূক্ষ্মরূপী মন অবস্থান করছে। এই পদ্মের অন্তশ্চক্রে পরম শক্তি স্থলে ত্রিকোণে ভ্রূর ঠিক উপরে বিশুদ্ধ জ্ঞান ও জ্ঞেয়স্বরূপ অন্তরাত্মা অবস্থান করছেন। এই অন্তরাত্মা দীপ শিখার ন্যায় উজ্বল আকৃতি বিশিষ্ঠ এবং প্রবনাত্মক। এই প্রণবের উর্দ্ধ ভাগে বিন্দু রুপি 'ম'কার। আর এই "ম"কারের আদিভাগে শুভ্রবর্ণ চাঁদের মতো নাদ অর্থাৎ শিবলিঙ্গ হাসিমুখে বিরাজ করছেন।
যেখানে অন্তরাত্মা অবস্থিত, সেখানে জ্বলন্ত দীপশিখার ন্যায় উজ্বল প্রভাত সূর্য্যের জ্যোতিঃ। এই জ্যোতিঃ আমাদের মাথা থেকে মূলাধার কমলের মধ্যস্থ ধরাচক্র পর্যন্ত বিস্তৃত আছেন। এখানেই সেই জ্যোতির্ময় সত্ত্বা, পূর্ন-ঐশ্বর্য্য অব্যয় ভগবানের সাক্ষাৎ লাভ হয়। এই আজ্ঞাচক্র-এর দ্বিদলপদ্মে বায়ুর লয়স্থান। তার উপরে মনশ্চক্র। মনশ্চক্রের উপরে আছে সোমচক্র । এই সোমচক্রে হংস বীজ অধিষ্ঠিত। এই হংস বীজের কোলে অবস্থান করছেন, পরম-শিব। পরমশিবের বাম দিকে আছেন নিত্যানন্দ স্বরূপিণী সিদ্ধকালী।